কাজী রাফি

নারী; শৈলী আর ভালোবাসার কারণ, কারণ যুদ্ধেরও। ‘লে জোঁ নদীর বাঁকে’ উপন্যাসে বসনিয়ান যুদ্ধের বলি সামরা নামের মেধাবি আর লাস্যময়ী তরুণী যখন জাতিসংঘে একজন কর্মকর্তা আফ্রিকায়; তখনো তার পেছনের ইতিহাস তাকে তাড়া করে ফেরে। উর্ধ্বতন কর্তার ক্ষমতা আর কামনার অনলকে যতই সে এড়াতে চাইল, অতীতের ভয়ংকর স্মৃতি থেকে পালাতে চাইল, ততই সে মানসিক আশ্রয়ের জন্য নীরিহ তরুণ শায়ানের কাছাকাছি হলো। শায়ানকে তার মনোভূমি থেকে সরাতেই যেন যুদ্ধের এক পটভূমি তাকে ঘিরে তৈরি হতে থাকে। এদিকে যুদ্ধরত দলগুলোর ব্যপক তাণ্ডবে ক্ষত-বিক্ষত শহরের মৃত মেয়রের লাশ নিয়ে ক্ষমতা ভাগাভাগির দ্বন্দ্বের রাজনীতিতে শহরে মৃত আত্মার আনাগোনা যখন চরমে এবং গির্জার পাদ্রিরাও অর্থ আয়ের পথ সুগম হচ্ছে বলে মেয়রের মৃতদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পিছিয়ে দিচ্ছে… এমন পরিস্থিতিতে পচনরত শরীরের মেয়রকে শহরবাসী মধ্যরাতে এমন বক্তৃতা বিবৃতি দিতে শুনলেন যে, তিনি পরের জন্মে মেয়র নির্বাচিত হলে প্রতিটি মানুষের যথাসময়ে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নিশ্চিত করবেন, কেন না, মৃত আত্মাও ঠিকানা খুঁজে ফেরে…। সামরা যখন রহস্যময় শহরের গোপন তথ্য জেনে যায়, তখন সে শায়ানকে নিয়ে মরিয়া হয়ে ওঠে তার প্রিয় এক ঔপন্যাসিকের কন্যা সুজানাকে উদ্ধারে। সুজানার প্রতি গির্জার শিক্ষানবিশ পাদ্রি তুসকানের নিয়ন্ত্রণহীন ভালোবাসা প্রতিহিংসাপরায়ণতায় রূপান্তরের কারণে সুজানাকে প্রথমে মিলিশিয়া নেতা পরে কর্নেল এরিখের বাহিনী ধর্ষণযজ্ঞে মেতে ওঠে। তাকে উদ্ধারে নিজের সাজানো নাটকে সামরাও এক সময় অপহৃত হয়। বাংলাদেশের নীল হেলমেট পরিহিত বাহিনী যখন সামরাকে উদ্ধারে মরিয়া ঠিক তখন শায়ান অভিযান পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারের সাথে নিজের পরিকল্পনা সমন্বয় করে নেয় তুসকানের ভালোবাসাকে পূজি করে স্থানীয় যুবকের সহায়তায় সামরা আর তুসকানকে নিয়ে আফ্রিকার নিঃসীম বনের ভেতর দিয়ে, লে জোঁ নদীর কিনার ধরে শুরু হয় তাদের রোমাঞ্চকর যাত্রা। তাদের আপাতত গন্তব্য; গভীর বন-জঙ্গলের মাঝে মুখ লুকিয়ে থাকা লে জোঁ নদীর দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে পৌছানো-যেখানে নদীটা তার বিস্তৃত মুখ বের করে মিলেছে সাসান্দ্রায়। সেখানেই কোনো এক ঘাঁটিতে এরিখের বাহিনী মেতে উঠেছে ‘সুজানা উৎসবে’। কিন্তু ভয়াল বনের মাঝে ভয়ংকর কিছু দৃশ্যে অজ্ঞান হয়ে যায় সামরা। অনিশ্চিত হয়ে ওঠে তাদের বেঁচে থাকা। অন্যদিকে সুজানার তাঁবুতে সুজানাকে ধর্ষণে মেতে ওঠা এক সদস্যের কানে কানে ফিসফিস করে কে যেন বলছে “উঠোনের লম্বা জল ধরার পাত্রটি থেকে হাতে রক্তমাখা চাকু নিয়েই নস্ত্রাদামু বের হচ্ছেন। তার গলা আর পা দুটি ঈগলের মতো যার শক্ত নখের মধ্যে ধরা আছে বিষাক্ত সাপ। আশ্চর্য! সাপটার মুখ এরিখের মতো। ফণা তোলা তবু ছোবল দিতে অক্ষম। কিন্তু তার ফণা তোলা বিষাক্ত দাঁত দিয়ে ঝরে পড়ছে পশ্চিম সাহারার রেডিয়াম। প্রচণ্ড বালি-ঝড়ের মধ্যেই সেই ফণার সামনে হাতে রেডিয়াম সংগ্রহের জন্য বোতল নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার কংকালের ছায়া। কয়েক শতাব্দির পুরনো সেইসব কংকালের পরিধানে নিজেদের এককালে ব্যবহৃত ফরাসি এবং আমেরিকার সামরিক পোষাক। অথচ তাদের কংকাল শরীরে শুধুমাত্র অস্তিত্বময় পুরুষাঙ্গ এমন এক নারীর গোপনাঙ্গে প্রবিষ্ট যে নারীর জননেন্দ্রিয় দিয়ে ঝরছে। গর্জনরত ভয়ংকর সেইসব ভাইরাস, যেসব ভাইরাসের মাথা চীনদেশের নির্জন পাহাড়ে বাস করা বিছা আর চোখ আফ্রিকার গভীর বনে বাস করা পেঁচার মতো…’ কাজী রাফির দুর্নিবার কল্পনার ডানা ধরে আবারও যুদ্ধের মাঠ, অপ-রাজনীতি, যুদ্ধের কারণে নারীর জীবনে নেমে আসা ভয়াবহ বিপর্যস্ততা, প্রেম-ভালোবাসা, অনিন্দ্য-প্রকৃতি আর মানব মননের মনোস্তত্ত্বের ব্যাকরণ এবং রোমাঞ্চকর অভিযাত্রার পটভূমি জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে ‘লে জো নদীর বাঁকে’ উপন্যাসে। তবু, ‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’র আমেজে সৃষ্টি ‘লে জো নদীর বাঁকে অনবদ্য এক প্রেমের উপন্যাস। কাজী রাফির লেখার বিষয়বস্তু ছোটগল্প এবং উপন্যাস। প্রথম উপন্যাস (প্রকাশনায় পঞ্চম) ‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’র জন্য পেয়েছেন এইচ এস বি সি-কালি ও কলম পুরস্কার-১০’। উপন্যাস এবং ছোটগল্পে অসামান্য অবদানের জন্য পেয়েছেন নির্ণয় স্বর্ণপদক-১৩।

প্রচ্ছদ
ধ্রুব এষ

প্রকাশক
অন্বেষা প্রকাশন

আইএসবিএন
9789849178798

প্রথম প্রকাশ
২০১৬

পাওয়া যাচ্ছে রকমারি ডট কমে

error: Content is protected !!