কাজী রাফি

১.

তিশা:
টিকেট হবে? আমতলা যাব।
টিকেট বিক্রেতা:
রংপুরের ভাড়া পরিশোধ করতে হবে।
তিশা:
আমার বাবা হাসপাতালে। হিসাব করে ওষুধ কিনে শুধু আমতলার ভাড়া বাঁচিয়েছি।
টিকেট বিক্রেতা:
লাইনে থাকুন; ভিড় কমলে যাবেন। টিকেট হবে না।
তিশা:
(যাত্রী ছাউনির পাশের মহিলাকে)
যাত্রী তো কমে না, বাড়ছেই শুধু!
মহিলা-১:
কতক্ষণ এখানে?
তিশা:
দুই ঘন্টা।
মহিলা-১:
বাড়ির দূরত্ব কত?
তিশা:
ত্রিশ মাইল, দুই ঘণ্টা।
মহিলা-১:
(ফচ শব্দে পানের পিচ পাশের নর্দমায় ফেলে)
রিকশায় যাও; বেলা ডোবার আগেই।
তিশা নিরুত্তর।

২.

টিকেট বিক্রেতা:
আর কতক্ষণ থাকবেন, উইঠ্যা পড়েন। ঠ্যালেন, ভাড়া না থাকলে মানষের সাথে ঠেলাঠেলি কইরাই যাওন লাগবে।
তিশা:
(বাসের ভেতর মু্রগির মতো ঠাসাঠাসি করে ঝুলে থাকা একজনকে)
এই যে ভাই, আপনার সিটের পাশে একটু দাঁড়ানোর জায়গা রাখবেন?
মানুষ-১:
(বিরক্ত চোখে, মুখে অস্ফুট শব্দ ছুড়ে, নিরুত্তর।)
মানুষ ঠেলে তিশা বাসের পা-দানির দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পুরুষরা ভিড়ের সুবিধা নিয়ে তিশার নরম শরীরে সজোড়ে ঠেলা দিয়ে পৌরুষত্ব উজ্জীবিত করে নেয়। কোনো রকমে সেখান থেকে বের হয়ে এসে তিশা হাফ ছেড়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস নেয়।
অসংখ্য সাদা বক পাখির ভারে নুয়ে আসা তার গ্রামের পাকুড় গাছটা থেকে যে বিষ্ঠা গন্ধ ছড়ায়, সেই বাজে গন্ধ এখানেও যেন ছড়ানো। তিশার বমি বমি লাগে।
টিকেট বিক্রেতা:
চিন্তা করেন ক্যা বাহে? যাবার না পারিলে মোর বাড়িত থাকিবেন।
বেলা দুটা থেকে এখন বিকেল চারটা।
লোকারণ্যের হাজার কণ্ঠ সময়কে স্তব্ধ করে রেখেছে। যাত্রী ছাউনিতে অপেক্ষারত পাশের দুই মহিলার দিকে অসহায় ভঙ্গিতে তাকায় তিশা। এই দুই মহিলাকে টিকেট বিক্রেতা মাঝে মাঝে পান এনে খাওয়াচ্ছে। কোথাও যাবার জন্য তাদের তাড়া নেই। কোন ফাঁকে তারা দুইজন বেঞ্চিতে বসা তিশার দুই পাশে আসন দখল করে বসে গেছে।
তিশা:
(ডান পাশের মহিলাকে)
উত্তর-পশ্চিম আকাশে কালো মেঘ জমছে। আমি কীভাবে আজ বাড়ি যাব?
মহিলা-২:
তোমার বাবার কাছত হাসপাতালত থ্যাকা যাও।
তিশা:
গতকাল রাতে ঐ হাসপাতালে রোগীর আত্মীয়া ধর্ষিত হয়েছে।
মহিলা-৩:
তাহলে আজ ওমন কিছুই হবে না, নিশ্চয়ই দুষ্টুগুলো পালিয়েছে। অসভ্য, জানোয়ার! বলি, হাসপাতালে কেন ওসব? ফুর্তি করার আর জায়গা পেলি না?
দূরে, রাস্তার অপর প্রান্তে লুংগি পরিহিত এক লোক মহিলাকে ইশারা করে কিছু একটা বুঝায়। ডান পাশের মহিলা তাকে হাতের ইশারায় কিসের যেন ফেরত সংকেত পাঠায়। তিশা এসবের কিছুই বোঝে না।
তিশা:
মেয়েটা লজ্জায় এবং ভয়ে কাউকে কিছু বলেনি। ওকে আজ রাতেও ধর্ষণ করবে এবং তাকে চুপচাপ থাকতে হবে। না হলে রোগি মারা যাবে। ওরা মেয়েটাকে ভয় দেখিয়ে হাসপাতালেই থাকতে বলেছে।
মহিলা-২:
মোরা কাঞ্চনপুর যামো, তুমি যাবা? কালকে তোমাকে ভাড়ার টাকা দিয়ে ফেরৎ পাঠামো।
তিশা:
আপনার বাসা বুঝি?
মহিলা-৩:
না। সুফিয়া, মমতা কামে যাবে ভারতত। বড় মায়া হয় মেয়েগুলানের জন্যি। ওদের বোর্ডার পার করে দিইয়া কাঞ্চনপুরেই…
তিশা:
আপনি বলতে পারেন আজ আমি কীভাবে বাড়ি ফিরে যাব?
টিকেট বিক্রেতা:
মুই এলায় কই বাহে, মোর বাড়িত চলেন। রান্দন করে খাওয়ামো… হে…হে।
হনহন করে বাসস্ট্যান্ড থেকে বেরিয়ে আসে তিশা।

৩.

তিশা:
বৃষ্টি নামবে। ইস কি জমকালো মেঘ নেমে আসছে!
নদীর দুই কিনার ফুঁসছে ততক্ষণ। বিষন্ন কান্নায় শ্রান্ত নদীর শুকনো কূলে দুলে ওঠে পরিত্যক্ত নৌকা।
তিশা:
চারমাথায় গিয়ে আমি কি কোনো প্রাইভেট কারকে হাত উঠিয়ে থামতে বলব? ‘লিফট প্লিজ। ত্রিশ মাইল মাত্র।‘
অজানা কণ্ঠ:
গাড়ির ভিতরে কোনো নারী থাকলে তোমাকে বেশ্যা ভাববে।
তিশা:
ঠিক আছে, যে গাড়িতে নারী নেই?
অজানা কণ্ঠ:
দিনাজপুরের জেসমিন! এবার আমতলার তিশা রব উঠবে। জেসমিনের ধর্ষণ-খুনে পুরুষের অভিজ্ঞতা আরো বেড়েছে। তোমার খবর কেউ পাবে না।
তিশা:
আমি কি কোনো থানা বা পুলিশ ফাঁড়ির সামনে নির্জন এক বেঞ্চিতে বসে চুপচাপ কাটিয়ে দেবো এই রাতটা?
অজানা কণ্ঠ:
তোমাকে দেখে পুলিশ পানের বোঁটা থেকে বেশি চুন চুষবে। চুনে মুখ পোড়ার অপরাধে ৪৪ ধারায় পুলিশ তোমাকে নির্জন এক কক্ষে আটকে …
তিশা:
তাহলে? আমি কি সুন্দর কোনো বাড়ির সামনে গিয়ে ছলছল হৃদয় আর চোখে ‘মানুষ মানুষের জন্য‘ গান নিয়ে আশ্রয় চাইব?
অজানা কণ্ঠ:
বাড়ির কর্তাকে রাতে বোবা ধরবে। ভুলে সে তোমার ঘরে ঢুকবে; সুন্দর বাড়ির সংসার আগুনে পুড়ে যাবে।
তিশা:
তাহলে তো সব বাড়ি পুড়ছেই।
অজানা কণ্ঠ:
পুরুষগুলো কুকুরের মতো সরল নয়। ভন্ডামীর লেবাসে ঐ শব্দটায় মানুষের মুখোশ লাগিয়ে তারা গোপন করে নিজেকে। মর্কট মেয়েরা চোখে সুরমা পরে থাকে। পুরুষের ভণ্ডামি তাদের চোখের সুরমা অতিক্রম করে না।
তিশা:
ঐ যে শ্যাওলা ধরা নির্জন দোতলা এক পরিত্যক্ত বাড়ি; চুপচাপ লুকিয়ে আজ ওখানে রাত কাটিয়ে দিতে পারি।
অজানা কণ্ঠ:
এ শহরের প্রেমিকরা বেকার। আর ঐ বাড়ি তাদের জোছনা-স্বর্গ। ফুসলিয়ে চাঁদে অবগাহনের নামে তারা ওখানে প্রেমিকাদের সর্বস্ব লুটে নেয়। প্রেমিকারা জানে না হাওয়াই বালিশ-বিছানা তার প্রেমিকের পকেটেই থাকে।
তিশা:
আমাদের অঞ্চলের এম পির বাসা নিশ্চয়ই রিকশাওয়ালা চিনবে? সাদা পাঞ্জাবী পরা সাক্ষাৎ দেবতা। মুখে তার সারাক্ষণ মিষ্টি হাসি।
অজানা কণ্ঠ:
তার বাড়ির প্রবেশ পথে বৈঠকখানা, তোমাকে স্নেহভরে বসতে দেবে।
তিশা:
হ্যা, কি নম্র গলায় তিনি আমাকে ‘মা’ ডেকেছিলেন!
অজানা কণ্ঠ:
আজ ‘আমি‘, ‘আমি‘ দিয়ে সে সব শুরু করবে। শেষ করবে তোমাকে সুন্দর এক ঘরে থাকতে দিয়ে।
তিশা:
কারণ তিনি মহানুভব!
অজানা কণ্ঠ:
ঘরটা তার নিজের বাড়িতে নয়।
তিশা:
কোথায় তবে?
অজানা কণ্ঠ:
সে জানে না।
তিশা:
তাহলে কে জানে?
অজানা কণ্ঠ:
তার পিএ, দলের সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক, নেতা, পাতিনেতা…
তিশা:
এত খবর রাখার তার সময়ই নেই?
অজানা কণ্ঠ:
অনেক সময়। পুরোটাই তোমাকে নিয়ে পরিকল্পনা করবে।
তিশা:
হাজার হোক, তিনি একজন জনদরদী নেতা।
অজানা কণ্ঠ:
প্রথমে নেতাই শুরু করবে। তারপর তার পিএ, সম্পাদক এরপর নির্মাতা দল।
তিশা:
কী শুরু করবে?
অজানা কণ্ঠ:
সিনেমা।
তিশা:
সিনেমা! শুধু থাকার জায়গা পেলেই হয়; সিনেমা দেখার আশা করি না।
অজানা কণ্ঠ:
এতে শূন্য বিনিয়োগ। অনেক মুনাফা। তাদের খায়েশ তোমাকে মেটাতে হবে। তারা কয়েকরাত মহড়া করিয়ে নিয়ে তোমাকে পাকা অভিনেত্রী বানাবে।
তিশা:
তারপর?
অজানা কণ্ঠ:
বিবৃতি আর পাল্টা বিবৃতি। তুমি ‘রাজনীতি’ নামের এক পর্ণো অভিনেত্রী! প্রেস কনফারেন্স। এম পি সাহেবের লিখিত বক্তব্য- ‘তিশা‘ নামে আমি কাউকে চিনি না; তার নামও শুনিনি। আমার চরিত্র হরণের জন্য বিরোধী দোল কর্তৃক মক্ষিরানীকে ভাড়া করা হয়েছে।’ আমতলা থেকে তোমার চৌদ্দ-গোষ্ঠির ঠিকানা মুহূর্তেই মুছে যাবে। গোয়ালন্দে তোমার পৈতৃক পরিচয়, জাতি-জ্ঞাতি সব স্থানান্তরিত হবে।

৪.

তিশা:
কোনো শিক্ষকের বাসা চিনিয়ে দেবে?
অজানা কণ্ঠ:
শিক্ষকরা এখন বয়সী সব গাছের ডালের মতো। এ সমাজের ন্যুজ মূল্যবোধ ভেঙে পড়ার মতো একটু ঝড়েই তারাও ভেঙে পড়েন। তাদের ঘরে আলো নেই। ঝড়-হাওয়ার বাদল দিন তারা। বৃষ্টি-জলে কান্না ধোয়া অভিযোজনে অভিযোজিত প্রাণি!
তিশা:
আমি তো কিছু চাই না। শুধু এক রাতের সম্ভ্রমের নিরাপত্তা। কোথায় নেবো আশ্রয় তবে? অন্ধকার রাত তবে তরুণীদের গন্তব্য কেড়ে নেয়!
অজানা কণ্ঠ:
হতাশ হতে নেই। জীবনই চূড়ান্ত গন্তব্য।
তিশা:
কোনো ডাক্তারকে গিয়ে কি আমি বলব যে, আমি অসুস্থ এবং এখন আমার পিরিয়ড চলছে। এখন একটা আশ্রয় আমার খুব প্রয়োজন। শুধু একটা রাত মাত্র! অসহায় এক মেয়েকে নিশ্চয়ই তিনি আশ্রয় দিবেন।
অজানা কণ্ঠ:
তার টাক মাথার অবশিষ্ট একটামাত্র চুল আনন্দে নেচে উঠবে। তোমাকে সে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নতুন এক আবিষ্কারের তথ্য জানাবে।
তিশা:
চিকিৎসা বিজ্ঞানের আমি কী বুঝব?
অজানা কণ্ঠ:
তুমি তার বাক্যটা বুঝবে।
তিশা:
কী সেই বাক্য?
অজানা কণ্ঠ:
এক ঘন্টার মধ্যে মেয়েদের পিরিয়ড চব্বিশ ঘন্টার জন্য বন্ধের ঔষধ আবিষ্কার হয়েছে।
তিশা:
কী অসভ্য!
অজানা কণ্ঠ:
তার পরের বাক্যটা শালীন।
তিশা:
তামাশা করার জন্য কথাগুলো বলেছেন নিশ্চয়ই? সেজন্য তিনি দুঃখিত বোধ করে আমাকে বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিবেন। আমি তো খুব ক্লান্ত।
শো শো ঝড় উঠেছে। অষ্টাদশী তিশার কাপড় উড়িয়ে নেওয়ার জন্য সেই ঝড়ও যেন উঠে পড়ে লেগেছে। আশ্চর্য! হাওয়ায় ধুলিকণা নয়, উড়ছে যেন মানুষ। শহরের প্রাচীন পার্ক, ‘দৈন্যতা‘ শব্দের আড়ালে তার সিমেন্টের তৈরী বেঞ্চিগুলোকে ঠাণ্ডা নিসঙ্গতার মাধুর্যে ভরেছে। এবার তারা বয়সি কোনো শহরবাসীর স্মৃতিচারণের উপযুক্ত হয়েছে।
অজানা কণ্ঠ:
সে বলবে, ‘চব্বিশ ঘন্টার জন্য পিরিয়ড বন্ধ থাকার জন্য তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। শরীর চাঙা করার ঔষধ তো আছেই।‘ জানোই তো, মৃত্যু ছাড়া সব দাওয়াই/বালাই এখন ডাক্তারদের…
অজানা কন্ঠকে তিশা:
আর শুনতে পায় না। প্রচণ্ড ঝড়ে ভেঙে পড়ছে বয়সী সব গাছের ডাল, উড়ে যাচ্ছে কাঁচা ঘরের টিনের চাল। গুমড়ে কাঁদছে নদীর কিনার।

৫.

তিশা:
আঁধার নেমেছে মেঘের কোলে কোলে। এই ঝড়ে অনেক নিরাপদ আমি।
অজানা কণ্ঠ:
নিরুত্তর।
তিশা:
ঝড়ের মাঝে আজ আমার গন্তব্য তবে।
তিশার পাশে একটা টিন উড়ে এসে পড়ে।
ঝড়:
শো… শো…
তিশা:
মরলে স্রষ্টার ইচ্ছায় আমার মৃত্যু হবে। এই ঝড় আর স্রষ্টার কাছে আমার আত্মসমর্পণ।
ঝড়:
শো… শো…
লাশকাটা ঘরের সাইনবোর্ডটা তিশার পাশে উড়ে এসে পড়ে।
তিশা:
পেয়েছি! পেয়েছি আমি। আমার ‘গন্তব্য’ পেয়েছি!
তিশার চোখ আনন্দে ভিজছে। বৃষ্টি-জলে কান্না ধোয়া অভিযোজনে অভিযোজিত সে-ও এখন। বৃষ্টির মাঝে নেমে এসেছে তিশা। সম্ভ্রম রক্ষার নিরাপত্তা নামের ‘গন্তব্য‘ পেয়ে ভিজছে তার ভেজা চোখ।
বৃষ্টি:
ঝম ঝম, রিমঝিম… শো… শো … ঝম ঝম।
তিশা:
(ঝড়কে লক্ষ্য করে)
ধন্যবাদ মা। আজ রাতে আমি লাশকাটা ঘরে থাকব। বীরপুরুষগুলো ‘মৃত্যু‘র কাপুরুষতায় আশ্রয় নেয় না। বড় ভয় তাদের মৃত্যুকে।
পুকুরের উপরেই লাশকাটা ঘর। নির্জনে নীরব ছায়ার মাখামাখিতে। পাশে এক ধানক্ষেত। অসংখ্য মৃত আত্মার চোখ নিয়ে প্রাচীন বটগাছ নিমীলিত দৃষ্টিতে তিশাকে দেখছে যেন। তিশা পা বাড়ায় পশ্চিমে, বটগাছের দিকে। লাশকাটা ঘরের নিশ্চিত এক আশ্রয়ে।
বটগাছ:
স্বাগতম মা।
লাশকাটা ঘর:
জীবনই চূড়ান্ত গন্তব্যস্থল।
মৃত্যু:
নিরুত্তর।

error: Content is protected !!