কাজী রাফি

তারকা এক হোটেলে সারাদিন অতিথিদের অভ্যর্থনা এবং রুম পর্যন্ত লাগেজ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতে থাকতে, দেশী-বিদেশি মানুষগুলোর আনাগোনা দেখতে দেখতে গাজী নাহিদ কিছুদিনের মধ্যে যেন পুরো ঢাকা শহরটাকেই চিনে ফেলল। কাছ থেকে দেখা তরুণ-তরুণী, অথবা সুন্দরী নারীকে বগলদাবা করা মধ্যবয়সী পুরুষের নিত্যনতুন জীবনের রঙিন অংশটুকু তাকে জীবন-ধারণের গোপন এক সূত্র শেখাল। এই চেনা আর শেখাটুকুর আত্মবিশ্বাসে সে অদ্ভুত এক সিদ্ধান্ত নিয়ে বসল। মোবাইলে ফোনে সংরক্ষিত হোটেলের নিয়মিত কিছু কাস্টমারের মোবাইল নাম্বার সে নোট বইয়ে টুকে নিল। তারপর কর্তব্য শেষে হোটেল কর্তৃপক্ষকে কিছুই না জানিয়ে সে পালিয়ে গেল।

তার সেই অদ্ভুত খেয়াল চরিতার্থের জন্য প্রথমেই সে ঢাকার অভিজাত পল্লিতে এক বাসা ভাড়ার নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু বাসা ভাড়া নেওয়ার আগেই অগ্রিম টাকার অঙ্ক শুনে তার চোখ কপালে উঠল। তবু দমাবার পাত্র সে নয়। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে সে আপাতত টিনের চালা দেওয়া দুই রুমের এক বাসা ভাড়া করে তবেই গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করল। বাড়ি ফিরে রাতের খাবার খেতে খেতে যেন সোনার খনির সন্ধান পেয়েছে এমন ভংগিতে স্ত্রী তাঞ্জিলাকে বলল, “বুঝলে বউ, ঢাকায় পাকাপোক্তভাবে বসবাসের জন্য বন্দোবস্ত করে এসেছি। এবার তোমাদের সবাইকে নিয়ে তবে ঢাকায় ফিরব।“
তাঞ্জিলা অবাক হয়ে অবিশ্বাসের ভঙিতে বলল, “কী বলো? তোমার বেতনে তো সংসার চলে না। গ্রামে সামান্য আবাদী জমি আমাদের সংসারের লক্ষ্মী। ঢাকায় গেলে ঐটুকু জমি আবাদ হবে কীভাবে?“

নাহিদ স্ত্রীর কথায় মিটমিট করে হাসে। যেসব স্বপ্ন ঢাকা থেকে সে থলেতে ভরে এনেছে তাই-ই একে একে বের করে তাঞ্জিলার অন্তরে স্থায়ী হয়ে বাস করা স্বপ্নকে কাঁপিয়ে দেয়। স্বামীর ভয়ংকর পরিকল্পনা শুনে সে বলে, “বুঝলাম জমি বেঁচে তুমি দুইমাসের অগ্রিম বাসা ভাড়া দেবে, কিন্তু প্রতিমাসে এত বাসা ভাড়া, মেয়েকে ভালো স্কুলে পড়ানো –এত টাকা পাবে কোথায়?“

নাহিদ ইশারায় স্ত্রীকে কাছে ডাকে। কানে কানে ফিসফিস করে তার পরবর্তী জীবন ধারণের পরিকল্পনার কথা বলে যায়। তাঞ্জিলা যেন ভুল শুনছে; চোখ কপালে তুলে, মাথার ঘোমটার একাংশ কামড়ে ধরে, ভাষাহীন অভিব্যক্তিতে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে সে। তারপর চোখে টলটল জল এনে বলে, “ছিঃ ছিঃ! জ্বিনা করতে আসা লোকজনের টাকায় আমাদের সংসার চলবে? পাপ দিয়ে স্বপ্ন পূরণ করার ইচ্ছা খুব খারাপ, তমার বাপ! তুমি যাও, তোমার সাথে আমরা ঢাকা যেতে চাই না।“
স্ত্রীর কথায় গাজী নাহিদের মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। হঠাৎই চুলার আগুন ধরানো কাঠ দিয়ে সে স্ত্রীকে বেদম প্রহার করতে করতে বলল, “হারামজাদী! তোর ভাতার তো এতদিন ওদের পাপ কামের পাহারাদার ছিল। সেই কামাইয়ের পয়সা খেতে পারিস আর এখন তুই আমার সাথে যাবি না? এদেশে যারা তোর বড় বড় বাপ তারা এই কাম করে সমাজে মানি লোক হতে পারলে, আমি সামান্য সংসার চালাতে পারি না?“

মধ্যরাতে তাঞ্জিলার ঘর্মাক্ত নগ্ন শরীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠা প্রহারের চিহ্নে আদর বুলাতে বুলাতে নাহিদ গাজী আবেগী কন্ঠে বলে, “বউ, বুড়া বয়সে গ্রামে এসে জমি চাষ করে খাই, তুমি তাই চাও? তার চেয়ে তো মরা ভালো।“
“কিন্তু তোমার মেয়ে যদি জেনে যায় …“

“স্কুল, প্রাইভেট এসবে ব্যস্ত থাকবে মেয়ে। সেই সময়টুকু এসব তুমি সামলাবে।“
“আমি কেন?“
“বাড়ির ছেলেমানুষ এগুলো করছে জানলে মেয়েগুলো প্রেমিকদের অন্য কোথাও ‘ডেটিং‘ করার কথা বলবে। ডেটিং মানে বোঝো? তাছাড়া আমি বাসায় থাকলে, মেয়েকে কী জবাব দেবে? ডাকাতি করে পয়সা কামাই করি?“
“বাইরে সারাদিন কী করবা?“
“জমি কেনা বেচার কৌশল শিখব। শুনেছি, টাকা ছাড়াই থার্ড পার্টিকে জমি দেখিয়ে অগ্রিম নিয়ে প্রথম পার্টিকে পেমেন্ট করা যায়… যাহোক, এসব তুমি বুঝবা না।“

২.

জমি,বাড়ি সবই বিক্রি করে দেয় নাহিদ। চোখের জলে বুক ভাসিয়ে, সংসারের টুকিটাকি জিনিসপত্র ছোট্ট এক ট্রাকে ভরিয়ে মেয়েকে পাশে বসিয়ে ঢাকা নামের এক জগতের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায় তারা। ঢাকা পৌঁছে বেদনাবিধূর চোখে তাঞ্জিলা স্বামীর মুখপানে তাকাল। গ্রাম থেকে অপরিচিত এই ঢাকা শহরে এসে তার মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। হাজার হাজার দালান-কোঠা আর অযুত জনস্রোতের ভিড়ে তাঞ্জিলার দম বন্ধ হয়ে আসে। বস্তির পাশে টিনের চালা দেওয়া বাসাটায় ঢুকে, গ্রামের ফেলে আসা বাড়িটার জন্য তার কান্নার ঢেউ উথলে উঠছে।

বাসা ভাড়া নিতে গিয়ে অগ্রিম টাকা দিতে চাইলেও কয়েকজন বাড়িওয়ালা নাহিদের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না পাওয়ায় তাকে ফিরিয়ে দিল। সুতরাং সে নিজের সামাজিক অবস্থান তৈরির অংশ হিসেবে নিজেকে অলীক এক কোম্পানীর এক্সিকিউটিভ অফিসার দেখিয়ে ভিজিটিং কার্ড বানিয়ে নিল। নীলক্ষেত থেকে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হতে ব্যবসায় প্রশাসনে মাস্টার্স পাশের নকল সনদপত্র বানিয়ে নিল।

এবার অভিজাত পাড়ায় নাহিদ সহজেই বাসা ভাড়া পেল। সমাজের নামী দামী লোকদের সাথে বানোয়াট দহরম-মহরম সম্পর্কের কথা বলে উল্টা বাড়িওয়ালার মনোযোগ আকর্ষণ করল।

রাজধানীর ঝকঝকে তকতকে বাড়িতে উঠে তাঞ্জিলা এবার সত্যিই স্বামীর মেধার প্রতি অনুরক্ত হয়ে উঠল। তারকা হোটেলে চাকরির সুবাদে তাস খেলতে আসা এক নেতাকে মাঝে মাঝে মদ সরবরাহ করত নাহিদ। নেতার দুর্বল মুহূর্তটুকু কাজে লাগিয়ে মেয়েকে ভর্তি করাল ভালো স্কুলে। তারপর দুজন মিলে ভাড়া নেওয়া বাসাটার এক কক্ষকে গোছানোর কাজে মনোযোগ দিল। দামি পর্দা, ছোট একটা ফ্রিজ, বিছানার মখমলে চাদর, অ্যাটাচ বাথরুমে বিদেশি টয়লেট্রিজ দিয়ে সাজাল সেই ঘর। ততদিনে তাদের বাস্তুভিটা, আবাদী জমি বিক্রির টাকা প্রায় নিঃশেষ হয় হয়। একদিন দুরু দুরু বুকে সে এক ধনীর নষ্ট দুলালকে ফোন করল, “পাপ্পু ভাই, আমি নাহিদ গাজী। ঐ যে … । ম্যাডামদের নিয়ে হোটেলে গিয়ে আপনাকে আর অত পয়সা খরচ করতে হবে না। বাড়ি ভাড়া নিয়েছি। হোটেলের মতো সুন্দর করে গোছানো এক ঘরে আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন।“

মেয়ে তমার স্কুল সময়টুকুতে প্রতিঘন্টা হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া ঘরটা প্রেমিক-প্রেমিকা,কলগার্ল বগলদাবা করা পুরুষের কাছে মহার্ঘ্য হয়ে উঠল। আর অবিশ্বাস্য দ্রুততায় হাতে কাঁচা পয়সা পেয়ে তাঞ্জিলাও বদলে যেতে থাকল। অনেক যুগল দুই/তিন ঘন্টার জন্য রুম ভাড়া নিয়ে তাঞ্জিলার কাছে টাকার বিনিময়ে খাবার চেয়ে বসে। নতুন এই সেবাতে অর্থের সমাগমটুকু তাঞ্জিলা স্বামীর কাছ থেকে গোপন করল। নাহিদ নিজেকে এই জগৎ থেকে দূরে রাখতে ভ্যাগাবন্ডের মতো সারাদিন এদিক-সেদিক নতুন নতুন অর্থ উপার্জনের পথ খুঁজে বেড়ায়। একসময় নাহিদের ফোন ছেড়ে তাঞ্জিলার সাথে ফোনে কন্টাক্ট করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে কাস্টমাররা।

আয়ের সাথে বেড়ে যাচ্ছে তাদের লাগামহীন খরচ। বাসার দারোয়ান, কেয়ারটেকার এমনকি সিঁড়িঘর ঝাড়ু দেওয়া বুয়াটা নাহিদের অপকর্ম গোপন রাখার শর্তে প্রত্যেক মাসে টাকা দাবি করে বসছে। বেড়ে যাচ্ছে মেয়ের খরচ। ল্যাপটপ, মোবাইল থেকে শুরু করে নিত্যনতুন চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হলেই তমা স্কুলে না যাওয়ার হুমকি দিয়ে বসে।

দিন দিন নাহিদের অতিথিশালার চাহিদা বাড়তে থাকে। কাস্টমারের চাহিদা মেটাতে তারা গোপনে কখনো কখনো রাতেও কক্ষটি ভাড়া দেওয়া আরম্ভ করল এবং তাঞ্জিলার পরামর্শে নাহিদ একনাগাড়ে এক বাসায় না থাকার সিদ্ধান্তে দুই/তিন মাস পর পর বাসা বদলাতে থাকল। বাসা বদলেই স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বদলে ফেলে তাদের মোবাইল সিম। পুলিশি ঝামেলা এড়াতে এই মোবাইল সিম তারা ভিক্ষুকদের পাঁচশ টাকা ঘুষ দিয়ে সহজেই সংগ্রহ করে। আর টাকা নিয়ে ঝামেলা পাকানো লোকগুলোকে তাঞ্জিলা প্রতিবার সযত্নে তার ডায়েরি-তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেয়। ঝামেলা পাকানো কাস্টমার জনবহুল ঢাকা শহরে তাঞ্জিলার আর সন্ধান পায় না।

বাসায় এখন সব পরিচিত বাঁধা কাস্টমার আসে। প্রতি যুগল অতিথিকক্ষে ঢুকে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেওয়ার পর তাঞ্জিলার হার্ট-বিট তার অজান্তেই বেড়ে যায়। বাড়তেই থাকে। মাঝে মাঝে দরজায় কান লাগিয়ে সে ঘরের ভিতরের শব্দ শোনার চেষ্টা করতে গিয়ে সেই হৃদস্পন্দনে আনল অস্বাভাবিক গতি।

একদিন ঘটল অদ্ভুত এক ঘটনা। একজন কাস্টমার তার সঙ্গিনী ছাড়াই এসে হাজির! ঘরে ঢুকে তাঞ্জিলাকে সে কাছে ডাকল। তাঞ্জিলা ঢিপ ঢিপ বুকে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। যুবকের চোখে কামনার লেলিহান শিখা। তাঞ্জিলাকে সে বলল,“আজ সাথী পাইনি। আপনি সংগীনি হলে ঘন্টায় পাঁচ হাজার …“

তাঞ্জিলা অর্থের চেয়েও তার বুকের মাঝে দিন দিন জেগে ওঠা এক অদম্য কৌতূহলের নেশা আর অতিক্রম করতে পারল না। সুতরাং তারপর থেকে মাঝে মাঝে কৌতূহলের এই রহস্যময় জগতে অবগাহন-আনন্দে ডুবতে ডুবতে তাঞ্জিলা ভুলেই গেল তার সবুজ-শ্যামল গ্রামটির কথা। যেখানে সে ফেলে এসেছে চন্দ্রমুখি এক ছাগলছানা। ছানাটি জন্ম দিয়ে মা ছাগল মারা গিয়েছিল বলে প্রবল বৃষ্টির দিনে ছানাটিকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ফিডারে গরুর দুধ ভরিয়ে নিয়ে সে খাওয়াত। কৌতূহলের ঘোর লাগা এই জগতে ডুবতে ডুবতে তাঞ্জিলা আরো ভুলে গেল, রিমঝিম রিমঝিম বৃষ্টির ক্ষণে উদাস ভঙিতে প্রায় ডুবে যাওয়া সবুজ মাঠটার পানে তাকিয়ে স্বর্গীয় এক অনুভূতিতে সে ভেসে যেত।

৩.

বড় হতে হতে, বাসায় ভিন্ন ভিন্ন যুগলদের আসা-যাওয়া দেখতে দেখতে তমা তাদের চোখ নামের জিহবায় জেগে থাকা ভাষাটা চিনতে শিখল। এক মধ্যরাতে চুপি চুপি অতিথিকক্ষের দরজায় কান রাখার পর, ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসা নেশা জাগানো শব্দগুলো তমার মনে কেমন এক নেশা ধরানো অশান্ততা তৈরি করল। তারপর থেকে তার রাতের ঘুম এলোমেলো হয়ে গেল। রাত জেগে ফেসবুকে ছেলেদের প্রোফাইল ঘাটতে ঘাটতে সুদর্শন এক যুবকের ইনবক্সে তমা লিখল ‘হ্যেই, হ্যান্ডসাম!‘ তারপর থেকেই কলেজে অনিয়মিত হয়ে গেল তমা। তার চেয়ে বসুন্ধরার সিনে কমপ্লেক্স, কেএফসি হয়ে গোপন কোনো আড্ডাস্থলে সে নিয়মিত হতে থাকল।

অন্যদিকে পাঁচ তারকা হোটেলের ছায়াজীবনে অভ্যস্ত নাহিদ সূর্য নামের একটি তারকার প্রচণ্ড খরতাপেও টাকার নেশায় ঢাকা শহরে টো টো ঘুরতে ঘুরতে মেয়ের রঙিন এই জীবনের সন্ধান পেল না। আর তার স্ত্রীর জীবনে মহামারি হয়ে আসা টাকা নামের বস্তুটাকে লুকানোর নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা তাঞ্জিলাও মেয়ের অধঃপতন ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারল না। তবে মায়ের অধঃপতন মেয়ে নিজের স্বার্থেই খুঁজে বের করল। দিন দিন টাকার প্রয়োজন বাড়তে থাকায় তমা মায়ের দুর্বলতম এই স্থানটির যথোপযুক্ত ব্যবহার করা শুরু করল। বাবার কাছে প্রয়োজনীয় টাকা না পেলেই মাকে জিম্মি করে সে ইচ্ছেমতন টাকা খসানোর অভ্যাসে অভিযোজিত হয়ে গেল। জামা বদলানোর মতো ছেলেবন্ধু বদলানো তমার জন্য আজকাল আর কোনো ব্যপার নয়।

এক বিকেলে তমা এসে তাঞ্জিলাকে বলল, “বাবাকে নিয়ে আগামী শুক্র-শনিবার দূরে কোথাও বেড়াতে যাও।“
“কেন? তুমি যাবে আমাদের সাথে?“
“না, ঐ দুইদিন বন্ধুদের নিয়ে বাসায় পার্টি করব।“
“আমরা বাসায় থাকলে সমস্যা কী?“

“অনেক সমস্যা। বাইরে ভালো কাপড় পরেও আমার বন্ধুদের কাছে যদি তোমাদের ভেতরের খবর যদি বের হয়ে পড়ে !“

সুতরাং একটা গাড়ি ভাড়া করে তাঞ্জিলা স্বামীকে বুঝিয়ে গাজীপুরের এক বাংলো বুকিং দিল। ভাড়া করা ট্যাক্সি ক্যাব নিয়ে সেখানে যাত্রা করল শুক্রবার ভোরে। পথিমধ্যে দূর্ঘটনায় পতিত হয়ে মাথায় জখম হলো নাহিদের। তমাকে তাঞ্জিলা কিছুই জানাল না। হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর আহত স্বামীকে নিয়ে বাসায় ফিরে অনেকক্ষণ কলিং বেল চেপে ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তমার মোবাইলে ফোন করল। মোবাইল বন্ধ। অবশেষে তমা দরজা খুলল। বাসার ভেতরে পাঁচজন ছেলে এবং তিনজন মেয়ের বেশভূষা আর চোখ-মুখের চাউনিতে কী যেন লুকানোর প্রবণতা। অতিথি কক্ষে দুটা ক্যামেরা-স্ট্যান্ড তখনো দাঁড় করিয়ে রাখা। সবকিছু দেখে হতভম্ব ভঙিতে তাঞ্জিলা প্রশ্ন করল, “তোর অসুস্থ্য বাবাকে নিয়ে কখন থেকে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। এতক্ষণ লাগে দরজা খুলতে?“
বাবার মাথায় ব্যান্ডেজ দেখেও বিকার নেই তমার। বিরক্ত আর কর্কশ স্বরে সে প্রত্যুত্তর করল, “অসুস্থ্য হলে তো হাসপাতাল আছে। তোমাদের বলেছিলাম দুইদিন বাসায় আসবে না। তোমাদের জন্য বন্ধুদের কাছে আমি ‘ছোট‘ হয়ে গেলাম!“

মেয়ের আচরণে শঙ্কিত নাহিদ কোনো কথা না বলে ধীরপায়ে তালাবদ্ধ স্টোররুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। মাত্র কয়েকদিন আগে অতিরিক্ত আয়ের উৎস তৈরি করতে গিয়ে সে অতিথি কক্ষে তাঞ্জিলার অজান্তে গোপন-ক্যামেরা বসিয়েছিল। আজ প্রথম গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা দৃশ্য দেখতে গিয়ে সে কম্পিউটারে চোখ রাখল। কম্পিউটারে যে দৃশ্য এখন সে দেখছে তা বিশ্বাস করতে নাহিদের কষ্ট হচ্ছে। তার মেয়ে ভিডিও করার আগে পয়সা নিয়ে লম্বা চুলওয়ালা ছেলেটার সাথে দর কষাকষি করছে!

নাহিদের জীবন থেকে লজ্জা নামক বস্তুটা কবে চিরবিদায় নিয়েছিল! সেই লজ্জাই আজ ফিরে এসে তাকে দু‘চোখ ঢাকতে বলছে। কোন এক দূর অতীতে মিলিয়ে যাওয়া তার ছোট্টবেলার শিক্ষকের মুখটা ভেসে উঠছে। নাহিদ তখন তার গ্রামের স্কুলের অষ্টম শ্রেণিতে। আষাঢ়ের তুমুল বৃষ্টির এক দিনে তার শিক্ষক বলছেন: শোন রে গাধার দল! মগ্নতা ছাড়া ভালোবাসা, সাধনা ছাড়া সফলতা, পরিশ্রম ছাড়া অর্থ উপার্জন, বই ছাড়া আত্মার পরিশুদ্ধি হয় না।

মেয়ে আর স্ত্রীর প্রতি চিৎকার করে সে বলতে চাইল ‘প্রতারক!‘ কিন্তু তার আগেই চেয়ার থেকে ঢলে পড়ল তার শরীর। দূরে, অনেক দূরে, এক পাতাঝরা গ্রীষ্মের বিকেলে, তার গ্রামে কাটানো আষাঢ়ি বর্ষার মেঘলা দিনে তার শরীর যেন ভেসে ভেসে যাচ্ছে। এক অদ্ভুত দৃশ্য ভাসছে তার চোখের সামনে তার বাবা নজিবরের শরীরের নিচে তমার বয়সী এক তরুণীর নগ্ন শরীর। হাত-পা ছুড়ে সে তরুণী তার বাবাকে চিৎকার করে বলছে ‘প্রতারক‘।

৪.

নাহিদ তখন সাত/আট বছরের এক শিশু। মাথার উপর দিয়ে মাঝে মাঝে যুদ্ধবিমানগুলো উড়ে যায়। গোলাগুলির শব্দ অনেকটাই কমে এসেছে। যুদ্ধের শেষ দিনগুলোর এক মেঘলা বিকেলে তার বাবা গাজী নজিবর এসে তাকে বলল, “তাড়াতাড়ি পাজামা-পাঞ্জাবিটা পরে নে।“

পাজামা-পাঞ্জাবি পরা হলে নাহিদকে সে আবার বলল, “শোন, দস্তগীর বাড়ির সবাইকে পাকিস্তানিরা গুলি করে মেরেছে। তার মেয়ে মেহেরুনকে আমি ময়েনুদ্দিনের বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছি। সে আমার সাথে একা যেতে চায় না। তুই বলবি, ওর সাথে তোকেও আমি নিরাপদ জায়গায় রাখতে যাচ্ছি। ঠিক আছে?“

বাবার কথায় ‘হ্যাঁ‘ সূচক মাথা দুলায় নাহিদ। এই দস্তগীরের বাড়িতে ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছে নজিবর। দস্তগীরদের জোত-জমি সে-ই দেখাশুনা করে। মেহেরুন নামের দস্তগীরের রূপসী কন্যা যত বড় হতে থাকল নজিবরের লোলুপ দৃষ্টি তার মেঘবরণ কেশগুচ্ছ হয়ে, দুধে আলতায় মেশানো তার গায়ের রঙের প্রতিটি কোণায় তত বিস্তৃত হতে থাকল। যুদ্ধ যেন অষ্টাদশি মনিব-কন্যার স্নিগ্ধ হাসি আর লকলকে শরীরটার প্রতি নজিবরের আজীবন লুকানো কামনা উসকে দিল। তাকে পাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে সে পাকিস্তানি আর্মি দিয়ে যেদিন দস্তগীর পরিবারকে খুন করাল সেদিনই সে মেহেরুনের কাছে ভালো মানুষ সেজে তাকে পাশের গ্রামের ময়েনুদ্দিনের বাড়িতে লুকিয়ে রাখল।

আজ মেহেরুন ছোট্ট নাহিদের হাত শক্ত করে চেপে ধরে নজিবরের পিছু পিছু হাঁটছে। সূর্য প্রায় অস্তমিত। হঠাৎ নজিবর থেমে গেল। সামনে পাকিস্তান আর্মির ক্যাম্প। পুকুর পাড়ে ঘাসে ঢাকা এক চত্বরে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে এক সৈনিক। নজিবর দ্রুত পরিত্যক্ত এক বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল। সবাই চিড়া কলা খেয়ে নেওয়ার পর নাহিদকে সে পাশের পরিত্যক্ত ঘরে যেতে বলল। নাহিদের হাত শক্ত করে ধরে মেহেরুন বলল, “তোমার সাথে আমিও যাব।“

মেহেরুনের হাত এক ঝটকায় সরিয়ে নজিবর পুত্রের চোখে রোষানলভরা দৃষ্টি হানল। নাহিদ ভয়ে পাশের ঘরে ঢোকামাত্র নজিবর দ্রুত ঘরের দরজা ভেতর থেকে আঁটকে দিল। ঘনিয়ে আসা আঁধারে অবুঝ নাহিদের দু‘চোখ বেয়ে কেন এত অশ্রু ঝরছিল তা সেদিনের ছোট্ট নাহিদ বুঝতে শিখেনি।

আকুল কান্নায় ভেঙে পড়া মেহেরুনের কন্ঠ নিঃসৃত সেদিনের হাহাকার ‘প্রতারক‘, ‘প্রতারক‘ শব্দে আজো ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে-বাতাসে। ছোট্ট নাহিদের চোখের সামনে যে ঘটনা ঘটেছিল তা আজ দৃশ্যকল্প হয়ে নাহিদের চোখের সামনে দুলছে
মেহেরুনকে ধর্ষণ শেষে তার বাবা তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানি ক্যাম্পের দিকে। বোমা এবং গোলার আঘাতে দেওয়াল থেকে খসে পড়া চুন সুড়কি আর ভাঙা জানালার গ্রিল ধরে সেই দৃশ্যের পানে আজ অবধি সে তাকিয়ে আছে।

প্রতারক, প্রতারক। সবাই প্রতারক!

সমাজের সাথে তার প্রতারণা কখন তাকেই জড়িয়ে নিয়েছে আষ্টেপৃষ্টে। বর্ষাস্নাত আষাঢ়ে তার শিক্ষক তাকে শেখাতে ভুলে গিয়েছিলেন- ‘প্রতারক শব্দটি ‘প্রতারণা’ হয়ে প্রবাহিত হয় রক্তধারায়— বংশ হতে প্রজন্ম পরম্পরায়।’ তবে শেষ নিশ্বাস ত্যাগের সময় নাহিদ গাজীর একটা কথা মনে পড়ল। কার যেন বুকের হাহাকার বিদীর্ণ করেছিল আকাশ-বাতাস। বাতাস থেকে সেই আর্তনাদ আজ সংগীতের মতো তার কানে অনুরণন তুলছে,
হায়! জগতে কোনো কিছুই অপ্রাপ্য থেকে যায় না। প্রতিটি মানুষকে তার কাজের প্রতিদান একদিন কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিতে হয়, বুঝে দিতেও হয়।

error: Content is protected !!