কাজী রাফি

বিরাট পদস্থ এক কর্তা হিসেবে অবসর গ্রহণের পর শফিউদ্দিন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে টের পেলেন তাকে চাকরিরত অবস্থার মতো আর কেউ গুরুত্ব দিচ্ছে না। সম্মান বলতে তিনি এতদিন মানুষের কাছে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলাকেই বুঝেছেন, যার উপকরণ দামি গাড়ি-বাড়ি, অভিজাত পোশাকে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান উপভোগ, থরে থরে সাজানো খাবার। চাকরিজীবনে তার কাছে সম্মানের নিয়ামক ছিল- তাকে দেখে মানুষ ভয় পাবে আবার তাকেই সর্বোচ্চ গুণের অধিকারী মনে করে তাকে পূজাও করবে। সুতরাং ‘পদোন্নতি’ নামক জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জনটুকু কবজা করতে যেসব কর্মকর্তা স্ত্রীকে সুন্দর করে সাজিয়ে-গুছিয়ে তার বাড়িতে এসে তার পা ছুঁয়েছে তাদেরকেই তিনি যোগ্য ভেবে দ্বিধাহীনভাবে পদোন্নতির জন্য জোর সুপারিশ করেছেন।

স্ত্রীদের সৌন্দর্য ছাড়াও তার সুপারিশের ধার নির্ভর করে- সামনে বসে যে যত ইনিয়ে বিনিয়ে তার প্রশংসার বান ছুটাতে পারে। তার ভাষ্যমতে, তিনি খুব রুচিশীল, বই পড়ার অভ্যাসটা তাই ধরে রেখেছেন। পদোন্নতিপ্রত্যাশী যারাই আসে, তাদের অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখে একসময় গুরুগম্ভীর চালে- ইংরেজিতে লেখা কোনো বই দশাসই দুই আঙুলে ধরে তাদের সামনে এসে তিনি বসেন। তখন তা লোহার স্টিয়ারিংয়ের মতো উলটপালট খেয়ে যেন রাবণের দশাসই হাতলে এমনভাবে প্রতিভাত হয় যে, মরণাপন্ন গ্রন্থটি পদোন্নতিপ্রাপ্তদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

তিনি পদোন্নতির প্রয়োজনেই লেখা অব্যয় অনিন্দ্য নামের তরুণ এক কর্তার বইয়ের রিভিউ পড়ে প্রথম জেমস জয়েসের নাম শুনেছিলেন! তার কাছ থেকে সেই যে বাইশ বছর আগে ইউলিসিস জোগাড় করেছিলেন- তা অদ্যাবধি শেষ হচ্ছে না বলে- তিনি ইতোমধ্যে চাকরি থেকে অবসর নেওয়া অব্যয়ের জাত-গোষ্ঠী কত নিযুতবার উদ্ধার করলেন, তার ইয়ত্তা নেই! কিন্তু কথাশিল্পী হিসেবে আজকাল বিখ্যাত হয়ে ওঠা অব্যয় অনিন্দ্যের লেখা অথবা কোনো সাক্ষাৎকার তিনি মাঝে মাঝেই পত্রিকায় দেখেন। টেবিলের এক পাশে পত্রিকাটা রেখে ইচ্ছে করেই সেদিন কোনো উছিলায় তার সেক্রেটারিকে মিটিং রাখার নির্দেশ দেন। সম্মেলনে গিয়ে মাত্র পত্রিকায় চোখ রাখার ভান করে এমনভাবে তা ছুড়ে দেন, তার অফিসে অথবা কোনো সম্মেলনে তার সামনে বসা কর্তারা ভড়কে যায়। তিনি বিরক্ত সহকারে লেখককে উদ্দেশ করে বলেন,

এসব করে ফাজিলটা চাকরিটা করতে পারল না। ‘কলা’র চর্চা যারা করে তারা কেমন হয়, জানোই তো। নিজেকে ড্যামেজ করল! অবশ্য এর জন্য আমার নিজেকেই দোষী মনে হয়। সে বাচ্চা অফিসার থাকতে আমাকে দিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে।

সামনে বসা ভদ্র এবং কর্মকর্তা সমাজ তখন ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে-

আপনাকে দিয়ে প্রভাবিত মানে, স্যার? আপনিও লেখালেখি করেন?

আরে ভাই, আমার একটা লেখা পড়েই তো তার মাথা নষ্ট। সেই ইয়াং এজেই। আমি লিখেছিলাম- মানে বুঝতেই পারো ূবিশাল কাণ্ড-কারবার। তারপর জেমস জয়েসের ওপর আমার পর্যালোচনা শুনে তার পড়াশোনার হাতেখড়ি। তারপর কোত্থেকে কী হয়ে গেল!

বিশাল কাণ্ড-কারবার কথাটা বলে তিনি বোঝাতে চাইলেন, তার মতো মান্যবর একজন মানুষ লেখার জন্য কলম ধরে এই জগৎকে ধন্য করেছেন। পদোন্নতিপ্রত্যাশী কর্মকর্তার মুখে তখন ফুলঝুরি-

কী আশ্চর্য! আপনি স্যার আসল জিনিয়াস।

আমি কলম ধরলে এ দেশে কত কিছু হয়ে যেত! জীবনভর শুধু ত্যাগই করে গেলাম।

চা-কক্ষে যখন তিনি এমন কথা বলেন, তখন তার সভাসদগণ দুঃখে হা হা করে ওঠেন। বসের জন্য তাদের অন্তর বিগলিত হয়ে ওঠে। কথাগুলো বলেই শফিউদ্দিনের মনে হলো- তার ঊর্ধ্বতন কর্তা আবার চাকরির বাইরে অন্য কোনো কিছুর প্রতি আগ্রহ খুব অপছন্দ করেন। কথাটা মনে হতেই তিনি ভিতরে ভিতরে ঘেমে যান। তার বসই নাকি বাৎসরিক গোপনীয় প্রতিবেদনে ‘চাকরির বাইরে আগ্রহ আছে এমন কোনো বিষয়’ নামক কলামটি সংযুক্ত করেছেন। তিনি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলেন-

ত্যাগ করে দুঃখ করতে হয় না, বুঝলা? ত্যাগের জন্য আল্লাহ আমাকে আরেকদিকে কত সম্মান দিয়েছে- চোখের সামনে সবই দেখতে পাচ্ছ। আমার সমান স্ট্যাটাস কি সে লেখক হয়ে এই সমাজে এবং এই দুনিয়াতে চিন্তাও করতে পারে?

‘বিশাল কাণ্ড-কারবার’ কথাটা যখনই তিনি বলেন, সাথে সাথে কপাল থেকে পুরো মুখমণ্ডল ডান হাতে একবার এনং বামহাতে দ্বিতীয়বার ওজুর মতো করে মাসেহ এবং খাঁটি বাংলায় মালিশ করার ভঙ্গিতে প্রক্ষালন করেন। জীবন নিয়ে পূর্ণতা এবং পরিতৃপ্তির সংকেত মস্তিস্কে পাঠাতে তার এটা নিজস্ব পদ্ধতি। চাকরি-সংক্রান্ত শনৈ শনৈ উন্নতির পেছনে যেসব পড়াশোনা তিনি করেছেন- তার মতে জগতে দশ-বিশটা পিএইচডি ডিগ্রি তার তুলনায় বড় নগণ্য। ঘোর থেকে তিনি বাস্তবে ফেরেন এবং উপস্থিত অফিসারদের উদ্দেশে বলেন,

সেই জন্যই আমাদেরকে সবাই হিংসা করে। বই পড়ে, লিখে কী হয়? ফালতু কাজ-কারবার। আমরা হলাম গিয়া রাজকীয় লোকজন। দেখো, হ্যারি আর মেগান ব্রিটিশ রাজপরিবার ছেড়ে গেলেও কানাডার সরকার আর জনগণ কত খুশি। হ্যারির পরিবারের শুধু নিরাপত্তার জন্য খরচ হবে বছরে পঞ্চাশ থেকে আশি কোটি মার্কিন ডলার। হ্যারির লেখাপড়া অথবা কাজের যে যোগ্যতা তা দিয়ে কানাডায় ইমিগ্রান্টও হওয়া যায় না। অথচ তাদের পায়ে তেল মাখতে মাখতে ট্রুডোর দিন যাবে, হাজার হোক রাজপরিবার! বিশাল কাণ্ড-কারবার।

তিনি কিছুক্ষণের জন্য থামেন। অব্যয়ের প্রতি তার মনের খেদ কমতে চায় না,

রাজকীয় ব্যাপার-স্যাপার ছেড়ে কেউ ভাঙা টেবিলে বসে বসে কেন কাগজ ঠেলে অথবা ক্লার্কের মতন ল্যাপটপ টিপে- বুঝি না। কেউ একজন তখন বলে বসে,

স্যার, ওটা আসলে এক ধরনের নেশা।

ঠিকই কইছ। ওগলানকে বলে, হ্যালোসেশান, ফ্যালাসিজম। একটা দামি জমি কি নিজের কথা বলে? দলিল লেখকরা জমিটা নিয়ে পাতার পর পাতা লিখে যাচ্ছে। দালালরা দৌড়াচ্ছে। আর জমিটা? সোনা ফলাচ্ছে। তোমরা হইল্যা গিয়া সেই সোনাফলানার মেশিন- এ মাটির শ্রেষ্ঠ সন্তান। কত আর বলি! হিংসা, বুজলা হিংসা। ফকিন্নির জাতি- হিংসা আর গাঁজাখোরিতেই মল্লো।

সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। হিংসার প্রসঙ্গ কেন এলো, কেন তিনি তাদের জানা অথবা চিন্তার বাইরে একটা বিষয় নিয়ে এত কথা বলছেন- তাও চা- বিরতি কক্ষের রাজকীয় সোফায় আসীন কর্তাদের বোধগম্য হচ্ছে না। তবু তারা মুখের স্মিত হাসিতে এমন ভঙ্গি ধরে রেখেছেন, যেন এত আনন্দের সময় তাদের জীবনে খুব বেশি আসে না। যেন জীবনে এত পাণ্ডিত্যপূর্ণ এবং দার্শনিক বক্তব্য শোনার সৌভাগ্যও তাদের আর হয়নি। তাদের দুই ঠোঁটের কোণে এমন ভঙ্গিমা বলে যে, শফিউদ্দিনের বক্তব্য এত মাধুর্যপূর্ণ যা আরব্য রজনীর গল্পকেও হার মানায়। যদিও একরাশ বিরক্তির দলা তাদের পেটের ভিতর কু শব্দের অর্থ জীবনে কোনোদিন তাদের কারো কানে পড়েনি ভেবে তাদের অন্তরাত্মা খাঁচারাম! শফিউদ্দিন অবশ্য এই শব্দ উচ্চারণ করার পর সম্মেলনের বিষয়বস্তুতে গিয়ে তাদের উদ্ধার করার নামে নিজে উদ্ধার হোন। কেন না, এই শব্দ নিয়ে তরুণ অব্যয়ের ঠোঁঠের কোণে বাঁকা হাসিটুকু তার মানসপটে ভেসে উঠে আজো তার কলজে কাঁপিয়ে দেয়। শফিউদ্দিনের শব্দ এবং উচ্চারণের ভুল ধরিয়ে অব্যয় বাইশ বছর আগে তাকে বলেছিল,

স্যার, আপনার বাসার ব্যক্তিগতভাবে খরচ করা অর্থ আমি সরকারি বিল হিসেবে স্বাক্ষর করতে পারব না।

সেইডা কে করতে বলিচে তোমাকে?

ভাবি বলেছেন।

এই দ্যাখো। মূর্খই রয়ে গেল্যা। কোন পরিবার থেকে আইছ, গো?

আমাকে হেনস্তা অথবা ভয় দেখিয়ে লাভ হবে না, স্যার। আবার বাবা একজন শিক্ষক। বই পড়ে আমি বড় হয়েছি। আমার আত্মা কোনো কিছুকে ভয় পায় না। আমাকে গালমন্দ করলেই আমি গলে যাব- এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। শফিউদ্দিন পরিবেশ হালকা করার জন্য বলেছিলেন,

না, তুমি মনডা খারাপ করচ ক্যান? কোনো মহিলা যখন তোমার বউ হবে তখন বুজবা, তারা কী জিনিস! তারা হলো সুপ্রিম অথরিটি, বুজিচো?

যাহোক স্যার, তাহলে বিলটা আপনিই স্বাক্ষর করে দিন। আর আপনার মুখে ‘বুজিচো’র মতো শব্দগুলো শুনতে খারাপ লাগে।

তিনি সেদিন তরুণটির সাহস আর ধৃষ্টতায় স্তম্ভিত তো হয়েছিলেনই, কীভাবে তার জ্ঞাতিগোষ্ঠী উদ্ধার করবেন- সেই ভাবনায় সাথে সাথে ভাষাও হারিয়ে ফেলেছিলেন। তবু শান্তভাবে তিনি তাকে বলেছিলেন,

আমি এমন এক পরিবারে বড় হয়ে উঠেছি- যেখানে আসলে বাংলার চলটা খুব কম।অব্যয় প্রত্যুত্তরে তাকে বলেছিল,

কিন্তু স্যার, আপনার ইংরেজির অবস্থা তো আরও ভয়াবহ খারাপ। আপনি উদ্ভট সব শব্দ দিয়ে বাক্য জোড়াতালি দেন। আমার কাছে ব্যাপারটা হাস্যকর মনে হয়। ভিতরে ঘামতে থাকা শফিউদ্দিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে চিৎকার করে ওঠেন,

গেট লস্ট। ইউ ইল্লিটারট অ্যাস-

তারপরের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি। অব্যয়ের উদ্দেশে অমন ভাষা প্রয়োগের জন্য তার প্রাতিষ্ঠানিক নিরাময় চেয়ে আবেদনপত্র পাঠিয়ে সে সর্বোচ্চ দপ্তর কাঁপিয়ে দিল। কিন্তু ফল হলো উল্টো। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে হেনস্তা করার জন্য প্রতিষ্ঠানের সমস্ত কর্তা একাট্টাই হলেন না শুধু; অব্যয়কে শায়েস্তা করার পথ বের করার জন্য বৈঠকের পর গোপন বৈঠক করলেন।

তরুণরাও এমন পরিস্থিতিতে মজা পেলেও তাকে ঘাউরা অফিসার বলে হাসাহাসি করল। ঘরের স্ত্রীদের কাছে তারা ছেলেটির বিভিন্ন নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক, অনৈতিক টাকা-পয়সা লেনদেনসহ হেন খারাপ কোনো ব্যাপার নেই, যা বলে নিজেদের বারবার মহান প্রমাণ করল না।

২.

সেই কবেকার কথা এসব। পরিস্থিতি এখন এমন- আজকাল কেউ আর হতাশ হয় না। এখন শুধু চাওয়া-পাওয়ার হিসাব। এবং সন্তানদের এ দেশ থেকে নিরাপদে দেশের বাইরে পাঠানোর চিন্তায় এমনকি অবিবাহিত কর্তারাও সময়কে ছকে বাঁধতে গিয়ে মন এবং মননকে শুধু হিসাবের দড়িতে বেঁধে নিয়েছে। কোনো শিক্ষা বা বই-পুস্তক নয়, ঊর্ধ্বতনরা যা বলে ূতাই-ই তাদের জন্য আজকাল আইন। সকলের গুরুদায়িত্ব এখন একটাই- তেল মারার কলাকৌশল রপ্ত করা। চা-বিরতির সময় সবাই একত্র হলে তাদের রপ্ত করা চাটুকারিতার বিদ্যাটির ধার টের পাওয়া যায়। তবে তা এমন শৈল্পিক পর্যায়ে তারা প্রয়োগ করে যে, তাদের প্রশংসনীয় কাজের তৎপরতা দেখে চা-বিরতি কক্ষ অলংকৃত করা শফিউদ্দিন খুশিতে ডগমগ হয়ে এত কথা বলেন! তার কলরব শুনে মনে হয়, দেশ যেন এইমাত্র স্বর্গে পৌঁছাল। তার এত খুশির প্রথম কারণ হচ্ছে, তিনি কক্ষে প্রবেশ করামাত্র পদোন্নতিপ্রত্যাশী একজন সোফা ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে বলেছেন,

অফিসার্স, মহামান্য-

রাষ্ট্রপতির জন্য সংরক্ষিত শব্দটি তার ক্ষেত্রে প্রয়োগ হলেও এ নিয়ে শফিউদ্দিন না জানার ভান নীতি অনুসরণ করেন। তাছাড়া জনগণের ভোটে কোন বধির অথবা মূর্খ লোক কী সব মন্ত্রী-এমপি হয়েছে তা নিয়ে তার অবজ্ঞার শেষও নেই। তিনি মনে করেন- তিনি রাষ্ট্রের হাল ধরলে এ দেশ তরতর করে চাঁদের দেশে কবে পৌঁছে যেত! তার ভাষ্যমতে,

বাঙালি একটা অসভ্য জাতি। বিভিন্ন দেশের লোকজন এ দেশের নারীদের ওপর চড়াও হয়ে এমন একটা সংকর জাতি তৈরি করেছে, যাদের শিক্ষাদীক্ষায় কোনো কাজ হবে না। এদের জন্য লাঠি একমাত্র সমাধান। যারা বেশি বেয়াড়া তাদের বিচার করে সময় নষ্টের বদলে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলাই যুক্তিসঙ্গত। তিনি আরও বলেন,

বিচারক-উকিলগুলান কি চান্দের দেশ থ্যাকা আসচে। সত্যি বললেই তো দোষ, এদের থেকে বড় রক্তচোষা আফ্রিকা-অ্যামাজনের জঙ্গল, কোথাও নাই। ওদের একসাথে নাম দেওয়া উচিত-‘চোষারক’।

বলে তিনি তিনি বিশ্বের কোন কোন দেশে ঘুরেছেন, সেসব দেশে কত মহিলা তার বুদ্ধিদীপ্ত কথায় মুগ্ধ হয়েছে তার ফিরিস্তি দেন। যদিও অস্ট্রেলিয়ার সাগরসৈকতের ঘটনা তিনি ঢোক গিলে গিলেও ফেলেন। সৈকতে বিকিনি পরা সেই নারীর সৌন্দর্য এখনও তার স্মৃতিপটে আগ্নেয়গিরির লাভার মতো উদ্‌গীরিত হতে থাকে! তিনি স্মৃতির মাঝে তলিয়ে গিয়ে নিজেকে আবিস্কার করলেন নেলসন বে নামক সাগর সৈকতে।

সমুদ্রসৈকতের বালির ওপর মাদুর বিছিয়ে ছাতার নিচে শুয়ে বিকিনি পরা অসম্ভব এক সুন্দরী নারীকে বই পড়তে দেখে শফিউদ্দিনের হিংসায় গা জ্বলে গেল। কেন এবং কিসে তার হিংসার অনল দাউদাউ করে জ্বলে তাকে অসুখী করল তা তিনি জানেন না। তবে, নিজের বয়স বাড়ার কারণে একই সাথে তিনি বিষণ্ণ হলেন। বিয়ে করার আগে কেন তিনি বিশ্বভ্রমণে বের হননি- তা নিয়েও তার আক্ষেপের শেষ নেই। তাহলে আগেভাগেই বিয়ে করে ঘরের পোষা প্রাণী হয়ে পড়তেন না। জেলখানার কয়েদিদের রুটিনেও হয়তো কিছু আনন্দ থাকে কিন্তু তার মনে হলো; এই চাকরি তার আত্মার উচ্ছলতা শেষ করে দিচ্ছে। তখনই তার মাথায় পরিকল্পনাগুলো একে একে খেলে গেল। হ্যাঁ, দেশে ফিরে বাসায় ঘন ঘন পার্টির ব্যবস্থা করবেন। তার চিত্ত উৎফুল্ল হয়ে উঠল। সাজগোজ করা সুন্দরী নারীদের দ্বারা তার আবাস কলকল হাসির স্রোতে ভরে উঠবে।

এতসব ভাবনায় খুশি হতে গিয়েও তিনি বিষণ্ণ হলেন যখন বইটার লেখকের নামের অক্ষরগুলো তার চোখের সামনে খোদাইলিপির মতো তাকে ভেংচি কাটল। বিশ্বখ্যাত লেখকের নামটি তাকে যেন সাগরসৈকতের বালিকণার সমতুল্য করে তুলল। সাথে সাথে বেগুনি ফুলের লাল বিকিনি পরা নারীর ঊরুদ্বয়ের মিলনস্থল থেকে ঝলসে ওঠা সৌন্দর্যের আলো তার হূৎস্পন্দনকে ছলকে তুলল। একটা ঢোক গিলে পুনরায় লেখকের নামটা তিনি পাঠ করতে গেলেন। ‘ঠাস’ করে একটা শব্দ হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারলেন- বিকিনি পরা শরীরী ভাঁজের সেই পরি মানুষের রূপ ধরেই ক্ষান্ত হয়নি, সে এখন বাঘিনীর মূর্তিতে আবির্ভূত। তার গালে কষে চড় লাগানোর পর ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলছে,

অসভ্য! সাক মাই অ্যাজ অ্যান্ড গো টু হেল!

সে দিনের কথা মনে হলে মেয়েটার ওপর রাগ না উঠে কেন তার সুশ্রী আঙুলগুলোর মাঝে ধরে থাকা সেই বইটার লেখকের ওপর রাগ জন্মে সেই সূত্রটা তিনি আজও পেলেন না। তখন তিনি বাথরুমে যান। সেই সুন্দরীর সেদিনের গালিগুলো এখনও শফিউদ্দিনের বাথরুমের চিত্তবিনোদনের সঙ্গী।

তবে লেখকদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ আর ঘৃণা পোষণ করেও পদোন্নতি প্রার্থীর সুন্দরী স্ত্রী সাথে থাকলে কেন তার হাতে একটা বই রাখার ইচ্ছা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তা তিনি জানেন না। বইটার কয়েক লাইন পড়লেই তার মাথার স্নায়ুতন্ত্র কাহিল এবং ঘুমকাতুরে হয়ে ওঠে। তবু পদোন্নতি প্রার্থী অফিসারের স্ত্রীর দিকে মুচকি হেসে তিনি বলেন,

আমি আবার বই ছাড়া থাকতে পারি না। শেক্সপিয়র কী বলেছে জানো তো? অন্ধকারে তুমি যা করো তাই-ই তোমার চরিত্র। পদোন্নতিপ্রত্যাশী অফিসার দুই হাঁটুর মাঝখানে শক্ত করে রাখা নিজের হাত কচলাতে কচলাতে বলে,

সেজন্যই স্যার, আপনার সাথে কোনো সমাবেশ, আলোচনা সভার জন্য সবাই মুখিয়ে থাকে। জীবনের জটিল কথা কত সরসভাবে আর সহজ করে বলা যায়- তা আপনার কথা না শুনলে বোঝা যাবে না। যেদিন আপনার কোনো সম্মেলন অথবা কোনো মিটিং থাকে সেদিন বাসায় ফিরে সারাদিন ওকে আপনার গল্পই করি।

কর্তাব্যক্তির স্ত্রীর দুই ঠোঁট কৃতজ্ঞতায় এমনিতেই গালের দুই প্রান্তে। তখন তার স্মিত হাসির রেখা ছোটে তেপান্তরে।

না, এসব অতীত স্মৃতিচারণ করে লাভ নেই। তিনি যেভাবেই হোক তার স্ট্যাটাসের সমান সম্মান সমাজ থেকে আদায় করেই ছাড়বেন বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। পুনরায় ফেসবুকে তিনি সরব হলেন। চাকরিরত থাকা অবস্থায় যদিও তিনি বলেছিলেন,

স্ট্যাটাসলেস, অকর্মণ্য লোকজন ওসবে স্ট্যাটাস খুঁজে বেড়াবে। আমরা কেন?

এই ফাঁকে তিনি অব্যয়ের ফেসবুকওয়াল দেখে নিলেন। সেখানে গিয়ে তার বন্ধু তালিকা ধরে ধরে তিনি সবার ওয়াল ঘাঁটাঘাঁটি করতেই থাকলেন। কোনো একটা ওয়ালে একটা ছবি দেখার পর তিনি অবশ হয়ে গেলেন। ভদ্রলোক বই পাঠরত একটা মেয়ের ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, আত্মীয়ের বাসায় দাওয়াতের জন্য রেডি হয়েও মেয়েকে উপন্যাসের পাতা থেকে ছুটানো যাচ্ছে না। অব্যয় অনিন্দ্যের বই পড়তে গেলে আমারও এমন ঘোরলাগা পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।

সেই তরুণীর মুখাবয়ব তার চোখের সামনে ভাসতে থাকল। ফিকে নীল, আটপৌরে শাড়িতে বারান্দায় হেলান দিয়ে কী গভীর মগ্নতায় সে উপন্যাসের মাঝে ডুবে আছে! অমন মায়াভরে উপন্যাসের মাঝের একটা পাতায় সে চোখ রেখে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। আহা, বইটা যদি তার লেখা হতো!

না, তিনি ভাবেন, বাজে এক চাকরি তার জীবন আবেগ-অনুভূতি সব কেড়ে নিয়েছে। যেভাবেই হোক মানুষের এমন ভালোবাসা তিনি অর্জন করেই ছাড়বেন। এবং তাদের দেখে তিনিও একইভাবে নিজের ওয়ালে তার জীবনাভিজ্ঞতার আলোকে লেখা শুরু করবেন বলে ভাবলেন। চেনা-অচেনা সমস্ত মানুষকে একের পর এক বন্ধু হওয়ার অনুরোধ পাঠালেন। কোনো কোনো সুন্দরী নারীকে মেসেঞ্জারেও নিজের বিরাট বিরাট সব পরিচয় দেওয়ার পর তাকে বন্ধু অনুরোধ গ্রহণের অনুরোধ করলেন।

‘অব্যয়কে ফেসবুকে জনপ্রিয়তায় ছাড়িয়ে গিয়ে আমি প্রমাণ করে দেবো- জীবনের সকল স্পেসে শফিউদ্দিনরা কত গুরুত্বপূর্ণ!’

নিজেকে বলা কথাটার বারবার তিনি প্রতিধ্বনি শোনেন। কিন্তু, বিধি বাম। দু-একজন মেয়ে তার বন্ধু অনুরোধ রক্ষা করলেও, বেশিরভাগই তাকে প্রত্যাখ্যানই শুধু করল না, অনেকেই তাকে ব্লক করে দিল। সুতরাং বন্ধুত্ব বাড়ানোর কৌশল তিনি বদলে ফেললেন। নিজের জীবনের বড় বড় অর্জনের সব ছবির সাথে মনোলোভা সব ক্যাপশন পোস্ট করার ভাষা খুঁজতে গিয়ে আবেগে ভেসে গেলেন। তার এইসব অর্জনে সতীর্থ চাকরিজীবীরা বেশ আগ্রহ দেখাল এবং প্রশংসাও করল। কিন্তু দিন দিন তা বাড়ার বদলে কমতে থাকল। সুতরাং যাদের সাথে তিনি চাকরি করেছেন খুঁজে খুঁজে তাদের মেসেঞ্জারে তার পোস্টের লিংক পাঠানো শুরু করলেন। কয়েকশ’জনকে পাঠানোর পর বাস্তবে যখন সর্বসাকল্যে ঊনচল্লিশটা লাইক পড়ল তখন সতীর্থ অফিসারদের তিনি বিড়বিড় করে দিনভর গালিগালাজ করলেন,

খানকির পুতগুলান, আমার পাছা চাটার জন্য জিব্বাটাকে টিস্যু বক্স বানাইছিল। সারাদিন কত তোয়াজ! মাদারচুতগুলান আমাকে আর চেনে না!

এবার তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন- ছবির মতো ফালতু জিনিস নয়, জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা দিয়ে অজানা-অচেনা মানুষের কাছে তিনি পৌঁছাবেন। ফলে লম্বা লম্বা স্ট্যাটাস দিতে গিয়ে তাতে মন্তব্য তো পরের কথা, চেনা-অচেনা লোকজন তার কথার সাথে বিতর্ক শুরু করে দিল। তাদের শফিউদ্দিন তার নিজের অবস্থানের বিশাল কাণ্ড-কারবার বোঝাতে গিয়ে যেদিন গালি খেলেন সেদিন তার মাথায় বুদ্ধি খেলল যে,

পত্রিকায় নিজের নাম দেখালে এরা আর তার মতের সাথে দ্বিমত পোষণ করার সাহস পাবে না।

যেমন চিন্তা তেমন কাজ। অব্যয়ের সাথে তিনি দেখা করবেন। বড় হতে হলে ছোট হতে তার আপত্তি নেই।

৪.

অব্যয়ের বাসার ঠিকানা নিয়ে একদিন তার মফস্বল শহরের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন। আরও কয়েকজন দর্শনার্থী এসেছেন তাদের প্রিয় কথাশিল্পীর সান্নিধ্য পেতে। কেউ এসেছেন সাক্ষাৎকার নিতে। শফিউদ্দিন কাঠের জানালায় মৃদু বাতাসে দুলতে থাকা সাদামাটা পর্দার ফাঁক দিয়ে দূরের মাঠ দেখে আনমনা হলেন। আবেগ সামলে তিনি বৈঠক-ঘর থেকে অব্যয়ের গাছপালা ঘেরা বাড়িটা দেখতে থাকলেন।

তার বাসায় দামি কিছুই নেই। আছে গাদা গাদা বই।

ধীর পদক্ষেপে অব্যয় এলেন। মানুষটার দীপ্তিময় ভঙ্গিমা দেখে নিজের অজান্তেই দাঁড়িয়ে পড়া শফিউদ্দিনের মনে হলো, অব্যয় তার চেয়েও কয়েক বছরের বড়! মায়াভরে শফিউদ্দিনের হাত ধরে অব্যয় জিজ্ঞাসা করলেন,

আপনি?

রাখঢাক ছাড়াই শফিউদ্দিনের ইচ্ছার কথা জানার পর অব্যয় পকেট থেকে একটা বৈচিত্র্যময় বর্ণখচিত বল বের করলেন। হাজার হাজার অণুসম অক্ষরের ছোট ছোট বিন্দুগুলোকে স্থির দৃষ্টিতে একেক সময় একেক আয়তনের মনে হচ্ছিল। অথচ এত ভিন্নতা নিয়ে প্রতিভাত বলটা একই আকৃতির। সেটা শফিউদ্দিনের মুখের সামনে ধরে তিনি বললেন,

বলটাকে দেখার এই ভিন্নতা তৈরি হচ্ছে রঙের কারণে। একজন শিল্পী জানেন, একটা জীবন আর একটা জীবনের চেয়ে কখনোই বেশি মূল্যবান নয়। স্রষ্টার সৃষ্টির যে কোনো জীবনের সাথে নিজেকে একাত্ম করার সংবেদনশীল স্নায়ুতন্ত্র ছাড়া কেউ শিল্পী হন না। আপনি কি মরে যাওয়ার আগে শরীরটাকে লাশ বানাতে পারবেন?

এই কথায় হতভম্ব শফিউদ্দিন মাথা চুলকালেন। জিজ্ঞাসা করলেন-

সেটা আবার কী?

আমাদের লোভে-ভোগে, হিংসা-পাপে আক্রান্ত শরীরের মৃত্যু না হলে আমরা কি আমাদের আত্মার কাছে পৌঁছাতে পারি? আর আত্মার কাছে না পৌঁছালে সৃষ্টির যন্ত্রণা কি বেঁচে থাকার স্বাদ হতে পারে?

শফিউদ্দিনের মনে হলো, সেই বয়সের প্রতিবাদী তরুণটা এই বয়সে নির্ঘাত পাগল হয়ে গেছে। মনোযোগ সহকারে অব্যয়কে দেখতে গিয়ে তার চোখের দিকে গভীরভাবে তাকাতেই তার ভিতর কেঁপে গেল। বয়সী অব্যয়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি সব ভাষা হারিয়ে ফেললেন, যেন এক গভীর সাগরের তলদেশে পতিত হয়ে নিঃশ্বাস খুঁজে ফিরছেন। তিনি চোখ ফেরালেন এবং কেন তিনি এখানে এসেছেন তা ক্ষণিকের জন্য ভুলে গেলেন। তার আগমনের উদ্দেশ্য মনে পড়ল যখন অব্যয় তাকে বললেন,

আলোকে ভিতরে ধারণ করতে হলে রশ্মির মতো ক্ষুদ্রকণা হয়ে যেতে হয়। মহান প্রকৃতি অথবা স্রষ্টার এই বিশ্বে নিজেকে একটা খড়কুটোর সমান তুচ্ছ ভাবতে পারার প্রাণশক্তি কি আপনার অবশিষ্ট আছে? নিজেকে তুচ্ছ ভাবতে শুধু নয়, সেই তুচ্ছতা ধারণ না করলে বিনয়ের আলোর সন্ধান হৃদয় কোনোদিন পাবে না।

চেষ্টা করব।

পারবেন, সম্মান, পদবি নামের মিথ্যা সামাজিক ধারণার পাহাড়গুলোকে লাথি মেরে উড়িয়ে দিতে? কবি-শিল্পী, গল্পের স্রষ্টা অথবা মরমি সাধনার মানুষের জন্য এই সামাজিক অথবা রাষ্ট্রিক ধারণাগুলো এক-একটা বাধার পাহাড়। আকাশে ডানা মেলে উড়তে চাইলে অহমকে মাটি দিয়ে মৃত্তিকা আর জলসংলগ্ন হতে হবে। তাহলে হয়তো সমতল এক সরল জগৎ চোখের সামনে উদ্ভাসিত হবে নিত্যনতুন বর্ণে এবং আকৃতিতে।

তার জন্য আমাকে কী করতে হবে?

আপনার সব সম্পদ মানুষের জন্য দান করে দিন। এই বিশ্ব এখন সফল মানুষদের পদভারে ভক্ষিত, লুণ্ঠিত। মানুষের অনিত্য, ক্ষণিক জীবনের অর্থবহতা কোথায়- আত্মা-সত্তা হারিয়ে মানুষ তা ভুলেই যাচ্ছে। অথচ এই পৃথিবীতে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাণকে স্রষ্টা পাঠিয়েছেন শুধু একটা গল্পকে আবিস্কারের জন্য। সৃষ্টি আসলে স্রষ্টার/প্রকৃতির এক অনন্য গল্পের বুননমাত্র। সেই গল্পের বুননের ভিতর উঁকি দিয়ে যিনি যত রহস্যের সন্ধান পান- তার জীবন ততটুকুই মূল্যবান। এর বাইরে সব মেকি আর ফাঁকি।

অব্যয়ের কথাগুলো শফিউদ্দিনের মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছিল। কথাগুলো শুনতে ভালো লাগলেও তাকে ঘোরতর পাগল বলেই তার মনে হলো। অব্যয়ের সাক্ষাৎপ্রার্থীদের কথাগুলোর সূত্র তিনি বুঝতে পারছিলেন না। তারা সবাই একসময় রাজপরিবারের মেগান আর হ্যারির ঘটনা উল্লেখ করে রাজাদের ভাঁড় এবং জনগণের ওপর অযাচিত বোঝা বলে বিবেচনা করছেন শুনে শফিউদ্দিন বিস্মিত হলেন। এদের আলোচনা যত গভীর হতে থাকল, শফিউদ্দিন ঘুমকাতর চোখে ততই অসহায় বোধ করলেন। মোপাসা, ভ্যান গঘ- এরা কারা?

ঘুমের তাড়নার তিনি ঢুলতে থাকলেন। সামান্য তন্দ্রার মধ্যেই একটা তারকা হোটেলে এক নগ্ন নারীকে স্বপ্নঘোরে নাচতে দেখে তিনি জেগে উঠলেন। এবার তার স্নায়ুতন্ত্র এত সচকিত হলো যে, ঘুম শব্দটা তাকে ছেড়ে পালাল। অব্যয়ের কথার চেয়ে স্বপ্নদৃশ্য কল্পনা করে বড় তৃপ্তি পেলেন। চনমনে শরীরে তার অদ্ভুত এক কামনা জেগে উঠল। এই আড়ম্বরহীন পাগলের আস্তানা থেকে তিনি পালাতে চাইলেন।

ফিরে আসার সময় তার মনে হলো, তার সারাজীবন অর্জিত সম্পদের পাহাড়টুকু এবার সদ্ব্যবহারের একটা পথ পেয়েছেন। অব্যয়ের বাসায় তন্দ্রাচ্ছলে তিনি যে জীবনের সন্ধান পেলেন ূতাও স্রষ্টার পাঠানো ইঙ্গিতই বলে শফিউদ্দিনের মনে হলো।

তিনি মোবাইল হাতে নিয়ে বহুকাল আগে জোগাড় করা এক ভিআইপি দালালের নাম্বার বের করতে করতে স্বগতোক্তি করলেন,

খ্যাতাপুরি ফেসবুকের। গুষ্টি কিলায় লেখালিখির। যত শ্যালা ফাউল, ভিক্ষুকের দল।

চাকরিজীবনকে নিরাপদ রাখতে যে নাম্বার খুলে বারবার দেখলেও তার কল-বাটনে চাপ দেওয়ার সাহসও তার হয়নি- তাকেই তিনি আজ ফোন করলেন এবং নিজেকে মোপাসা পরিচয় দিয়ে সদম্ভ কণ্ঠে বললেন,

টাকা যতই লাগুক, জিনিসটা যেন কচি এবং সরেস হয়!

প্রকাশিত হয়েছে সমকালে

error: Content is protected !!